স্টাডি

CSE না EEE?

আমরা আমাদের চারপাশে আজকাল শুধু প্রযুক্তির খেলা দেখছি। আর এসব প্রযুক্তির মধ্যে সবচেয়ে মনোযোগ আকর্ষণকারী বস্তুটি সম্ভবত কম্প্যুটার। এটা দিয়ে কত কী যে হচ্ছে তার ইয়ত্তা নাই। এখন আবার কম্প্যুটারের ধরণও পালটে গেছে। আমাদের বাসায় প্রায় এক যুগ আগে প্রথম যে কম্প্যুটারটা কেনা হয়েছিল, আজকাল সেই দামে বা আরও কম দামে তার চেয়ে বেশি ক্ষমতার মোবাইল ফোনই কেনা যাবে। এগুলোকে বলা হচ্ছে স্মার্ট-ফোন। আসলে নামে ফোন হলেও এগুলো এক একটা কম্প্যুটারই। আর এমন নানা ধরণের যন্ত্র আজকাল বাজারে আসছে, সামনেও আসবে। সেগুলোর মধ্যে এত বৈচিত্র্য যে কোথায় কম্প্যুটার থাকবে না সেটাই দেখার বিষয়।
আমরা দেখলাম, এই নতুন ধরণের নানা আকারের ও বৈশিষ্ট্যের বৈচিত্র্যময় যন্ত্রগুলোকে এখন আর কম্প্যুটার বলা হচ্ছে না, বলা হচ্ছে “স্মার্ট” ডিভাইস। স্মার্ট ফোন, স্মার্ট হাতঘড়ি, স্মার্ট গাড়ি থেকে শুরু করে আস্ত শহর পর্যন্ত স্মার্ট হয়ে যাচ্ছে। তা এই স্মার্ট দুনিয়ায় কম্প্যুটার সায়েন্সের কাজ কেমন হবে? তার আগে একটা কথা বলে নিই। সেটা হলে কম্প্যুটার সায়েন্সের কাজ কী? কী করবে কম্প্যুটার সায়েন্স পড়ে? কাজটা হল- “স্মার্ট বানানো”। কেউ যেন আবার কম্প্যুটার সায়েন্সকে ফ্যাশন ডিজাইনিং মনে করবেন না তাই বলে। আমাদের দেশে স্মার্ট শব্দটা ব্যবহার করা হয় খুব কেতাদুরস্ত পোশাক পরা, ভাব-সাব নিয়ে চলা ছেলেদের ক্ষেত্রে। কখনও কখনও মেয়েদের ক্ষেত্রেও। আসলে কিন্তু স্মার্ট শব্দটার মানে “যার ঘটে কিছু বুদ্ধি আছে”। ডিকশনারি দেখে নিতে পারেন এক ফাঁকে। তো যেটা বলছিলাম- আমাদের মানে কম্প্যুটার সায়েন্টিস্টদের কাজ হল স্মার্ট বানানো। কাদেরকে? ঐ যন্ত্রগুলোকে যাদের আমরা স্মার্ট বলি।
আসলে কিন্তু এগুলো নিতান্তই বোকা যন্ত্র। কতখানি বোকা সেটা কম্প্যুটার নিয়ে না পড়লে ঠিক বোঝা যাবে না। এদের বোকামি নিয়ে অনেক কৌতুক আছে। যেমন একটা হল- আপনি যদি কম্প্যুটারকে একটা বন্ধ ঘড়ি আর একটা ৫ মিনিট স্লো ঘড়ির মধ্যে কোনটা ব্যবহার করবেন জিজ্ঞাসা করেন, সে বলবে বন্ধ ঘড়িটাই ব্যবহার করতে। কারণ, এই ঘড়িটা দিনে দুইবার হলেও সঠিক সময় দিবে। কিন্তু অন্য ঘড়িটা কখনই ঠিক সময় দেবে না। চাইলে এর মধ্যে আরও অনেক শর্ত আবিষ্কার করা যায়। যেমন- ঘড়িটা কাঁটাওয়ালা অ্যানালগ ঘড়ি হতে হবে ডিজিটাল হওয়া যাবে না ইত্যাদি। কিন্তু বোকা বলি আর যাই বলি না কেন, একটা ক্ষমতা এদের আছে, একবার কোন একটা ব্যাপার ঠিকঠাক মত বুঝিয়ে দিতে পারলে, তারা সেটা এমন অবিশ্বাস্য গতিতে এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে করে যেতে থাকে যে সেটা মানুষের দ্বারা সম্ভব না। তবে গোলটা হল ঐ “ঠিকঠাক” এর মধ্যে। বোকা যন্ত্রকে কিছু ঠিকঠাক মত বোঝানো খুবই কঠিন এবং ধৈর্যের একটা কাজ। আর এটাই হল কম্প্যুটার বিজ্ঞানীদের কাজ। যারা বিষয় নির্বাচনের ঝামেলার মধ্যে আছ, তারা চিন্তা করে দেখ এই কাজটা তোমাদের ভাল লাগবে কিনা।
বোকা যন্ত্রকে একের পর এক ঠিক ঠিক নির্দেশনা দিয়ে কোন কাজ করার উপযোগী করার এই ব্যাপারটাকে বলা হয় “প্রোগ্রামিং”। প্রোগ্রামিং এর সাথে আগের পড়ে আসা বিষয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভাল সম্পর্ক বোধহয় গণিতের। কারো যদি অঙ্ক করতে ভাল লাগে, আশা করা যায় তার প্রোগ্রামিং ও ভাল লাগবে। তবে এই ভাল লাগাটা কিন্তু সাজেশান থেকে বারবার প্র্যাকটিস(পড়ুন মুখস্থ) করে পরীক্ষায় কমন আসা প্রশ্নের উত্তর উগলে দিয়ে এ+ পাওয়া ম্যাথ এর ব্যাপারে হলে হবে না। বরং ব্যাপারটা অনেকটা এরকম- একদম আনকোরা নতুন অঙ্ক, যেটা নিয়ে চিন্তা করে ধাপে ধাপে সমাধান করতে হবে। কখনও হচ্ছে, কখনও হচ্ছে না। না হলেও হাল না ছেড়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছ। এরপর একসময় যখন সমস্যাটার সমাধান হয়, সেটা ভিতরে একটা অন্যরকম আনন্দ পাওয়া যায়। সেই আনন্দকে যারা পছন্দ কর, তাদের জন্যই প্রোগ্রামিং মজার হবে আশা করি। এজন্য যাদের গণিত অলিম্পিয়াড জাতীয় প্রতিযোগিতায় আগ্রহ ছিল, তারা বিশেষভাবে CSE-এর কথা চিন্তা করে দেখতে পার।
সমস্যা সমাধানের প্রতি আগ্রহের সাথে সাথে কম্প্যুটার সায়েন্সের জন্য আরও যেটা দরকার বলব, সেটা হল কাজের ব্যাপারে পারফেকশনিস্ট হওয়ার। মানুষ বা অন্যান্য বুদ্ধিমান(গরু এবং গাধাকেও এর মধ্যে ধরতে হবে) প্রাণীদের সাথে যোগাযোগ করা বা নির্দেশ দেওয়া ইত্যাদি ক্ষেত্রে আমরা সাধারণত সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে একেবারে বিস্তারিত বলি না। কারণ এদের কম-বেশি “আক্কেল” আছে। আর কথায় আছে- “আক্কেলওয়ালাদের জন্য ইশারাই যথেষ্ঠ”। আক্কেল কম হলে ইন্সট্রাকশান আরেকটু বেশি দিতে হবে এই আর কী। কিন্তু কম্প্যুটারের মত একেবারে খাঁটি বেক্কল যন্ত্রকে সব-কিছুই একেবারে খুঁটিনাটি সহ বুঝিয়ে দিতে হয়। যদি কখনও না হয়, তাহলে বুঝতে হবে সেই কাজটা অন্য কোন প্রোগ্রামার বা কম্প্যুটার বিজ্ঞানী আগেই করে রেখেছেন। এই ক্ষেত্রে সবকিছু একবারে নিখুঁত পারফেক্ট করার মানসিকতাটা খুব জরুরী। যদিও সবকিছু শেষ পর্যন্ত পারফেক্ট হবে না হয়ত। কিন্তু প্রথম থেকে চেষ্টাটা থাকলে পরে ঝামেলা কম হবে। সাথে সাথে লেগে থাকার ব্যাপারটাও থাকে। তবে লেগে থাকার ব্যাপারটা মনে হয় সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, শুধু কম্প্যুটার সায়েন্সের ক্ষেত্রে না।
সব শেষে যেই গুণটার কথা বলব- সেটা হল ইনোভেটিভ চিন্তা-ভাবনা। নতুন নতুন আইডিয়া বের করা আর সেটার বাস্তবায়নের জন্য চেষ্টা করা। জানি এটাও শুধু কম্প্যুটার সায়েন্সের ক্ষেত্রে না, সব ক্ষেত্রেই সত্যি। তবে কম্প্যুটার সায়েন্স বা আর বড়ভাবে চিন্তা করলে আইটি এর ক্ষেত্রে বলতে হয়, এখানে নতুন আইডিয়া আনার এবং সেটাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সুযোগ অন্য যে কোন ক্ষেত্রের চেয়ে বেশি। এখনও সব সময় নতুন নতুন আইডিয়া আসছেই। এবং এমন একটা আইডিয়া বদলে দিতে পারে আমাদের জীবন। একার না, সাথে আরও অনেক মানুষের জীবন। আমরা আজকাল আমাদের দৈনন্দিন জীবনের উল্লেখযোগ্য একটা অংশ ফেসবুকে ব্যয় করি। কাজে হোক বা অকাজে। এটা আইডিয়ার একটা উদাহরণ মাত্র। কম্প্যুটার সায়েন্স বা আইটি ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে কোন আইডিয়া নিয়ে কাজ করা মনে হয় এতটা সহজ না।
মোটকথা কেউ যদি কম্প্যুটার সায়েন্স বা CSE-তে পড়তে চায়, তাহলে তার এটা মনে রাখতে হবে যে, তাকে মাথা খাটাতে হবে। এজন্য আমি এই বিষয়টাকে ইঞ্জিনিয়ারিং এর চেয়ে সায়েন্স বলতেই বেশি পছন্দ করি। তবে আমাদের এই দেশে শুধু মাথার উপর কিছু চলে না। সাথে সাথে কখনও কখনও নির্ভেজাল কায়িক শ্রমেরও (মুখস্থ, ঠোঁটস্থ করার) প্রয়োজন পড়তে পারে। শিরোনাম দিয়েছিলাম “CSE না EEE?” স্বাভাবিকভাবে মনে হতে পারে আমি আমার সাবজেক্টের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের চেষ্টা করব। কিন্তু সত্যি কথাটা হল- আমি নিজের সাবজেক্ট নিয়ে যতটা জানি, খুব স্বাভাবিকভাবেই অন্যান্য সাবজেক্টগুলো নিয়ে তেমন জানি না। আমি এখানে আমার সাবজেক্টকে সবচেয়ে ভাল প্রমাণ করতে চাইনি। চেয়েছি কাদের জন্য সাবজেক্টটা ভাল হবে সেটা নিয়ে লিখতে। এখানে যা যা লিখেছি, সেটা অন্যান্য সাবজেক্টের জন্য যে প্রযোজ্য হবে না এমন কোন কথা নাই। এভাবে সবাই নিজের সাবজেক্টের কথা যদি বলে, তাহলে যারা এখন “কোন সাবজেক্ট নিব” এই টেনশনে আছে, তাদের জন্য কাজটা সহজ হয়ে যায়। আর যারা সাবজেক্ট নেয়া না নেয়া নিয়ে চিন্তা করছ তাদের বলি- “CSE ভাল না EEE?” বা “কোন সাবজেক্টটা সবচেয়ে ভাল?” এভাবে না ভেবে বরং ভাব কোন সাবজেক্টটা তোমার জন্য ভাল হবে। সেটা তুমিই ভাল বুঝতে পারবে।
আমাদের দেশে পড়াশোনার ব্যাপারে কিছু ভূত আছে। বেশির ভাগ সময় বাব-মার মাথায় প্রথমে চাপে সায়েন্সের ভূত, তারপর ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানোর ভূত। আরেকটা ভূত আছে- ক্যারিয়ারের ভূত। এসব ভূতের পাল্লায় পড়ে আমাদের চিন্তা-ভাবনা গুটিকয়েক সাবজেক্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। যোগ্যতা অনুযায়ী মেধার বন্টন হয় না। অথচ ভাল করলে যেকোন সাবজেক্ট থেকেই ক্যারিয়ার গড়া যায়। যে কিনা খুব ভাল একজন অর্থনীতিবিদ, পদার্থবিদ বা সমাজবিজ্ঞানী হতে পারত, দেশের জন্য বয়ে আনতে পারত বড় কোন সম্মান, সে বড় বেতনে ন’টা-ছ’টা অফিস করে জীবন পার করে দেয় কিংবা পাড়ি জমায় বিদেশে। এই মানসিকতা থেকে আমাদের বের হয়ে আসা উচিত।

Leave a Comment