আউটসোর্সিং টিউটোরিয়াল টেক সমাধান

ফেসবুক ও সমাজের মনস্তাত্ত্বিক বিবর্তন

আনোয়ারা আজাদ

বন্ধু-বান্ধবদের উৎসাহেই ফেসবুকের জগতে প্রবেশ করতে হয়েছিল। বেশ কিছুদিন নিয়মিত এক ঘণ্টার মতো সময় ব্যয় করে বোঝার চেষ্টা করেছি এর গুরুত্ব। হ্যাঁ, গুরুত্ব আছে বৈকি। বেশ কিছু ইনফরমেশন মিলে বটে তবে জীবন থেকে প্রতিদিন কমপক্ষে একটি করে ঘণ্টা এভাবে কিছু মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত ছবি দেখতে দেখতে ব্যয় হবে মেনে নিতে পারি না। কি করব বলুন, মনের পরিসর বাড়াতে পারছি না যে!

যা হোক, ফেসবুকে নানা সাবজেক্ট পোস্ট করার যে অনেক শক্তি সেটা অনুধাবন করতে বেশি সময় লাগেনি আর। ফোর জি’রও প্রয়োজন হয়নি। স্লো পয়জনিংয়ের মতো কাজ করে যাচ্ছে। ফেসবুকের যাতনায় খুব সহজেই যে একটা সমাজের মনস্তাত্ত্বিক বিবর্তন ঘটে যাচ্ছে সেটা বুঝতেও বেশি মেধা খরচ করতে হয় না। সবাই যার যার বিষয়বস্তু নিয়ে ফটোগ্রাফিতে হাত পাকানোর কিংবা নিজেকে দেখানোর এমন হুড়াহুড়ি, মনোজগতের যে বিরাট একটা পরিবর্তন নিয়ে আসছে সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।

রাজন হত্যার নির্মম দৃশ্যাবলি দিয়েই শুরু করি। আগেরগুলো নিশ্চয়ই এতদিনে সবাই ভুলে যেতে বসেছে তাই রাজন দিয়েই শুরু। যারা এই কাজটার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল (নাম উচ্চারণ করতেও ঘৃণা বোধ করি) তারা কিন্তু খুব আনন্দের সঙ্গেই কাজটি সম্পন্ন করেছে! যেন বেশ একটা মজার খেলা দেখানো যাচ্ছে! সিংহের সঙ্গে মানুষের খেলা! দেখরে দেখ তামাশা দেখ! ওরা কেন মনে করল যে এটি একটি নতুন খেলা? এতে কোনো অপরাধ নেই? এই খেলাটি আপলোড করলে দুনিয়ার মানুষ বেশ একটা মজার ছবি দেখতে পাবে! যেমন অনেকেই মজা পায় কোনো অনুষ্ঠানে খাওয়া ভর্তি টেবিলে বসে ক্যামেরার দিকে পোজ দিয়ে ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করা!

সায়েন্স ফিকশনে ভবিষ্যতে যে বিবর্তনের আভাষ দেওয়া হয় এগুলো কি তারই সূত্রপাত? মানুষ নামের একটা জীব আর অস্ত্র! যার শক্তি আছে তারই জিত! আমার ইন্টারনেট কানেকশন আছে, আমার মোবাইলে ক্যামেরা আছে, আমার স্বাধীনতা আছে যা খুশি, যেমন খুশি আমি তোমাদের দেখাতে পারি! দেখে তোমাদের কি রি-অ্যাকশন হচ্ছে সেটা বোঝার দায়িত্ব আমার নয়। আমি তোমাদের দেখাতে পেরেছি এটাই আমার ক্রেডিট!

ফেসবুকে প্রবেশ করার কিছুদিন পরই ছোট বেলার এক বন্ধুকে খুঁজে পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, যাক যোগাযোগটা এবার নতুন করে শুরু হবে। একদিন দেখি বন্ধু তার রাজকীয় ড্রয়িংরুমে তার আদরের কুকুরটিকে নিয়ে একটা পোজ দিয়ে ছবি পোস্ট করেছে। অনেকক্ষণ ভাবলাম ছবিটা নিয়ে। এই বয়সে এ রকম একটা ছবি, বন্ধু কি কুকুরপ্রেমী? আগে তো কখনো শুনিনি।

হ্যাঁ এ রকম ছবি সে তুলতেই পারে হাজারটা। কিন্তু ছবিটা যখন সে আপলোড করবে তখন সে খানিকটা ভাববে না যে, এটা এখন শত শত মানুষ দেখবে এবং বিষয়টা একেকজনে একেক রকম করে ভাববে? একটা বিষয় যখন আমরা শেয়ার করতে যাব তখন এগুলো ভাবার প্রয়োজন আছে বলেই আমার ধারণা। সব বিষয় নিশ্চয়ই সবার সঙ্গে শেয়ার করি না আমরা। করি কি না? সেই থেকে সরাসরি সেই বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ আমার। কেন জানি ইচ্ছেটা বেলুনের মতো চুপসে গেল। ক্ষুদ্র মন আমার।

ছবি পোস্ট করা নিয়ে আরও বেশ কিছু বন্ধুর সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে গেল ভাবা যায়! বেশ তো বন্ধুত্ব ছিল এতদিন!  এয়ারপোর্টে ট্রলি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি এ রকম একটি ছবি এক বন্ধু পোস্ট করে দিল আমার নিষেধ থাকা সত্ত্বেও! এটা যে একান্তই আমার একটা ব্যক্তিগত বিষয় সেই বোধটা কোথায় জানি ডুবে গিয়ে ছবিটা পোস্ট করাই মুখ্য হয়ে গেল! তো ছবি পোস্ট করার সূত্রপাতেই বন্ধুত্ব খতম! সেই ছবি দেখেই আর দশজন হায় হায় করে উঠল, আরে তুমি কোথায় গেছিলা, কার সঙ্গে গেছিলা, ও কেন তোমার ছবি পোস্ট করল ইত্যাদি।

এটাও একটা বেশ খেলা কিন্তু। তার ইচ্ছে হয়েছে সে পোস্ট করেছে। কেউ কেউ প্রতিদিনই তার নতুন নতুন পোজের ছবি দিয়েই যাচ্ছে। সে নানা রকমের ছবি, কোনটা ছেড়ে কোনটার কথা বলা যায় বুঝতে পারছি না।

এক বন্ধুর নিমন্ত্রণে টেবিল ভর্তি খাবারদাবার সামনে রেখে পোজ দিতে হলো সবাইকে। পোজ না দিলে চলবেই না। খাবার ভর্তি টেবিলসহ। টেবিলে পোলাও মাংস, মিষ্টি মিষ্টান্ন আর কত কি দিয়ে ভরা। খাও না খাও ছবিতে থাকলেই হবে। সঙ্গে সঙ্গেই ফেসবুকে চলে গেল সেটা। কোনো মানে হয় কি না? বুঝতে পারি না এটা কোন ধরনের রুচি। এক সপ্তাহ পর আর এক বন্ধুর নিমন্ত্রণ, অপারগতা প্রকাশ করলে খেউ খেউ করে উঠল, হ্যাঁ ওর বাড়িতে তো খুব যাও, যত ঢং কর আমার বেলায়!

প্রাইভেসির আর থাকল কি না বলুন? আমি কোথায় খাব আর কোথায় খাব না সেটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত, কিন্তু ব্যক্তিগত আর থাকল কই। নাহ্ কোনো প্রাইভেসিই আর কেউ রাখছে না। শুধু এক্সপোজড হওয়ার তাড়না! এই তাড়না কোথায় নিয়ে যাচ্ছে সমাজকে? কীভাবে যেন শুধু গ্রাস করে নিচ্ছে সব বোধ-বুদ্ধি। প্রেমের সম্পর্কগুলোই নাকি অর্ধেক ভেঙে যাচ্ছে ছবি পোস্টের কারণে। বাকিগুলোরও যে বেহাল অবস্থা সে তো নিজেই প্রমাণ।

সেলিব্রিটিদের দেখা পেলেই অনেককেই দেখি কাকুতি মিনতি করে ধরে দাঁড় করিয়ে দিয়েই সেলফি তুলে পোস্ট করে দিল। সেও কি বিখ্যাত হয়ে গেল জানি না। গলা ধরে তুলতে পারলে তো কথাই নেই। প্রোফাইল পিকচার হিসেবে ওটাই রেখে দিচ্ছে। ছবিটা সে কেন পোস্ট করল দেখে তো বোঝা যায় নাকি! দু-একজন উক্তি দিয়ে আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে, ‘যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে, মুক্ত করো হে বন্ধ’…ক্ষুদ্র মানসিকতা নিয়ে বসে থাকার কোনো মানেই নেই বন্ধু! লাইনে আসো। লাইনে আর আসতে পারি না। শুধুই লাইনচ্যুত হয়ে যাই।

রাজনের হত্যাকারীরাও ছবিগুলো সবার সঙ্গে যুক্ত করতে চেয়েছিল। তাদের যে রুচি, যে সংস্কৃতি সেভাবেই তারা যুক্ত হতে চেয়েছিল পুরো পৃথিবীর সঙ্গে। ফ্রি সংবাদ দেওয়ার সুযোগ যদি থাকে সেটা গ্রহণ করাই নাকি আধুনিকতা। পয়সা খরচ করে তো সংবাদপত্রে দিতে হচ্ছে না। প্রযুক্তি এই যে সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে তার সদ্ব্যবহার করা অবশ্যই উচিত। একেকজনের হাজারেরও ওপরে ফেসবুক বন্ধু আছে, বিনে পয়সায় কত শত মূল্যবান সব তথ্য প্রচার হয়ে গেল, এটা কম পাওয়া! কার সঙ্গে ঘুরছি, কি কি খাচ্ছি, কি রংয়ের পোশাক পরেছি, কখন…।

হিজাব পরেও নানা রকম ছবি পোস্ট করতে দেখা যাচ্ছে। রাতে রেস্টুরেন্টে বসে সেহরি খাওয়ার ছবি পোস্ট করছে কেউ কেউ, এসব মানসিকতার মাথামুণ্ড কিছুই উদ্ধার করতে পারছি না। শুনেছি ছবি আপলোড করায় অনেকেই অ্যাডিকটেড হয়ে যাচ্ছে। কি ভয়ংকর কথা। তাই শুধু রাজনের হত্যাকারীদের নির্মম দৃশ্যাবলি দেখে আঁতকে উঠি না আমি। এসব ছবি দেখেও মন-মানসিকতার এই বিবর্তন দেখেও আঁতকে উঠছি।

Leave a Comment